English || Aribic

মসাধিককাল পার হলেও মতিঝিলের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন না হওয়ায় আল্লামা শাহ আহমদ শফী’র ক্ষোভ ও হতাশা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা সত্ত্বেও কেন কুরআন পোড়ানোর ঘটনায় কাউকে এতদিনেও ধরা হলো না

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) ১৩ জুন, ২০১৩ ঃ ৫ মে রাতে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে নীরিহ আলেম ও তৌহিদী জনতার উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও গণহত্যার ঘটনার এক মাস অতিবাহিত হলেও সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন না করায় ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন হেফাজতে ইসলামের আমীর দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক দেশের শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

আজ এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ৫ ও ৬ মে দেশে এত বড় মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল, নির্বিচারে ঘুমন্ত, কান্ত ও যিকিররত লাখ লাখ অভুক্ত আলেম ওলামার ওপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষকে হতাহত করা হল, অথচ সরকার এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করে যাচ্ছে। উল্টো সরকার হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ হেফাজত নেতাদের গ্রেফতার করে, অসংখ্য মামলা দায়ের করে পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা করেছে। সুস্থাবস্থায় আল্লামা বাবুনগরীকে গ্রেফতারের পর ২২ দিন রিমান্ডে নিয়ে গুরুতর অসুস্থাবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে মুক্তি দেয়া হলেও তিনি এখনো গুরুতর অসুস্থ।

এত বড় ঘটনার পর ওলামায়ে কেরাম ও হেফাজতকর্মীরা প্রতিশোধমূলক কোনরূপ ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডে না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখে চরম ধৈর্যধারণ করলেও এখনো দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, সেদিন মতিঝিলের শাপলা চত্বরে তেমন কিছুই ঘটেনি এবং এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকার হেফাজতের আন্দোলন দমন করে ফেলেছে , হেফাজতের ১৩ দফা দাবিও চাপা পড়ে গেছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সেদিন শাপলা চত্বরে সরকার হেফাজতকে সরিয়ে দেয়ার নামে রাতের আঁধারে বাতি নিভিয়ে যে ভারী অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে হাজার হাজার র্যাব বিজিবি ও পুলিশ নিয়ে যে বর্বর অভিযান চালিয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে আর কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। সেই রাতে বুলেটের আঘাতে শহীদ হওয়া আলেম ওলামার সংখ্যা যাই হোক না কেন, সেটা যে গণহত্যা, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেবল মাত্র স্বাধীনতার আগে পাক হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চের কালরাত্রে এমন বর্বর নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছিল। এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু কলংকজনক অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে না, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের একটি সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক অমানবিক নৃশংসতার দলীল হয়ে থাকবে। এর দায় ও খেসারত বর্তমান ক্ষমতাসীনদের এখন থেকে যুগ যুগ ধরে বহন করতে হবে। আর সরকার নিরীহ লাখ লাখ আলেম ওলামাকে অস্ত্রের মুখে হটিয়ে, মামলা মোকদ্দমার ভয় দেখিয়ে হেফাজতে ইসলামকে দমন করে ফেলতে পেরেছে মনে করলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। আলেমরা যে ১৩ দফার জন্য রক্ত দিয়েছে, এই রক্ত কখনো বৃথা যাবে না, ইনশাল্লাহ। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত হেফাজতের চলমান প্রতিবাদ কর্মসূচী চলবে। ৯০ ভাগ মুসলমাদের এদেশে হেফাজতের ১৩ দফা দাবি জনগণের স্বতস্ফূর্ত সমর্থনেই পূরণ হবে, ইনশাল্লাহ। কারণ হেফাজতের এই দাবির প্রতি সমর্থন রয়েছে এদেশের কোটি কোটি মানুষের।

তিনি বলেন, দেড় লক্ষাধিক বুলেট ব্যবহার করে কী নির্দয়ভাবে ৫ মে মধ্যরাতে হেফাজত কর্মী ও আলেম-ওলামাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। ওই রাতে কত আলেম-ওলামার প্রাণসংহার হয়েছে, কতজন শহীদ হয়েছেন, তা নিয়ে শুধু দেশবাসী নয়, পুরো বিশ্বই আজ উদ্বিগ্ন। হেফাজতে ইসলাম যে ১৩ দফা দাবী উপস্থাপন করেছে, তা তো কোন ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থকে সামনে নিয়ে নয়। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থেই তো এসব দাবীগুলো পেশ করা হয়েছে।

হেফাজতে ইসলামসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থা থেকে বার বার দাবী জানানোর পর এক মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে এখনো পর্যন্ত কোন বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। এটা চরম উদ্বেগ ও হতাশাজনক। তিনি বলেন, ৫ ও ৬ মে নিয়ে শুধু হেফাজতে ইসলাম বা দেশের জনসাধারণ নয়, জাতিসংঘ, এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বও চরম উদ্বিগ্ন। তারাও জানতে চায়, সে দিন রাতে কী ঘটেছিল এবং কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

হেফাজত আমীর বলেন, এত বড় ভয়াবহ ঘটনার পর একটা স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের নীরব ভূমিকা মানা যায় না। নাগরকিদের জানমাল ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অথচ রাষ্ট্রই প্রতিবাদী নিরপরাধ জনগণকে শত্রু বিবেচনা করে সরাসরি গুলি বর্ষণ করে হত্যা করছে। হেফাজত আমীর সরকারের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা নিজেদেরকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার বলে দাবী করে থাকেন। ৫ ও ৬ মে গণতন্ত্রের কোন ধারা প্রয়োগ করে নিরপরাধ নাগরিককে গণহত্যার শিকার করলেন? মুখে গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের কথা বলবেন, অথচ কাউকে কথা বলতে দিবেন না, লিখতে দিবেন না, প্রতিবাদ করতে দিবেন না, এভাবে কত দিন জনগণকে দাবিয়ে রাখবেন?

বিবৃতিতে আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, শাহবাগে যারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, ইসলামের চরম অবমাননা করেছে, দেশের কৃষ্টিকালচার ও আদর্শ বিরোধী কাজে লিপ্ত থেকেছে, তাদেরকে তিন মাসব্যাপী সরকারী নিরাপত্তা দিয়ে পরম যতেœ জন-চলাচলের পাথ ও রাস্তা অবরোধ করে থাকতে দেওয়া হলো। কিন্তু ইসলাম ও ঈমানের ইজ্জত রক্ষার জন্য, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা ও শান্তির জন্য কিছু দাবী নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অভুক্ত অবস্থায় নীরিহ উলামা-মাশায়েখ ও তৌহিদী জনতাকে এক দিনও বসতে না দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানো হল। তিনি বলেন, সরকারকেই বলতে হবে, সে দিন ও রাতে কত জন মানুষকে তারা হতাহত করেছে, কারা পবিত্র কুরআন পুড়িয়েছে, সড়কের গাছ কেটেছে এবং লুটপাট চালিয়েছে। পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই রাতে দেড় লক্ষের উপর গুলি খরচ করেছে। সরকার এর প্রতিবাদ করেনি। এই বিপুল গুলির লক্ষ্যবস্তু কী ছিল, তা জানানোর দায়িত্ব সরকারের।

বিবৃতিতে হেফাজত আমীর আরো বলেন, গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন ভালো বলতে পারবেন, ঢাকার বাইরে থেকে যেসব মাদ্রাসার ছাত্র-শিক বা আলেম-ওলামা ঢাকায় প্রবেশ করেছেন, তাদের হাতে গাছ কাটা করাত-কুঠার জাতীয় কিছু দেখা গেছে কি? তাদের সঙ্গে পানির বোতল আর কিছু চিড়া-মুড়ি ছাড়া কিছু ছিল কি? তারা শাপলা চত্বর এলাকায় শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়ে বসে ছিলেন। ওই সময় বায়তুল মোকাররমের দণি গেট ও পশ্চিম পাশে যা ঘটেছে, সেখানে কি বাস্তবিকই কোনো হেফাজত কর্মী ছিলেন? গ্রাম থেকে যেসব মাদ্রাসার ছাত্র-শিক সে দিন ঢাকা এসেছিলেন, যারা এর আগে কখনো ঢাকা শহর দেখেনওনি, তাদের পে কি ওই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করা আদৌ সম্ভব ছিল? যাদের ধ্যান-জ্ঞান শুধুই কুরআন-হাদিস, তাদের পে কি সেই কুরআন-হাদিসে আগুন লাগানোর কথা কল্পনা করাও সম্ভব? অথচ সব দোষ চাপানো হলো হেফাজতের নিরীহ কর্মীদের ওপর। দেশের জাতীয় মসজিদের সামনে পবিত্র কুরআন শরিফে আগুন লাগবে কিংবা কোথাও কোনোভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, তা কোনো মুসলমান মেনে নিতে পারে না। এক সাথে এত কুরআন পোড়ানোর নজির বিশ্বের কোথাও নাই।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম, যখন প্রধানমন্ত্রীর মুখে শুনেছিলাম যে, ‘যারা কুরআনে আগুন দিয়েছে তাদের কাউকে ছাড়া হবে না। ভিডিও ফুটেজ দেখে একটা একটা করে ধরা হবে।’ কিন্তু এক মাস গত হয়ে গেলেও এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন তৎপরতাই চোখে পড়ছে না। ভিডিও ফুটেজ দেখে এখনো পর্যন্ত একজনকেও গ্রেফতার করতে দেখলাম না। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন পোড়ানোর মত এত বড় ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা সত্ত্বেও কেন কাউকে এতদিনেও ধরা হলো না?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, চলমান নাস্তিক্যবাদ বিরোধী আন্দোলন ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছিল। হেফাজতে ইসলাম সারা দেশে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচীসহ অসংখ্য বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে। বিগত ৬ এপ্রিল সারা দেশ থেকে ঢাকা অভিমুখী লংমার্চ ও স্মরণকালের বৃহৎ মহাসমাবেশ করেছে। একই দিনে দেশের একাধিক জেলায় মহাসমাবেশ করেছে। কিন্তু কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, মারদাঙ্গা হয়নি। দেশবাসী হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তিনি বলেন, ওলামায়ে কেরাম ও ক্বওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা সহিংস রাজনীতির সাথে মোটেও পরিচিত নয়। তারা প্রচলিত রাজনীতির কূটচাল ও মারপ্যাচ সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। এই নীরিহ মানুষদেরকেই বিগত ৫ তারিখ শিকারে পরিণত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ৫ ও ৬ মে’র গণহত্যায় জড়িত ও হুকুমদাতারা আল্লাহর বিচারের হাত থেকে কখনো রেহাই পাবে না। কাকে কীভাবে পাকড়াও করা হবে, তা একমাত্র তিনিই ভাল জানেন। দেশের লাখ লাখ ওলামা-মাশায়েখ ও নিরীহ মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদী জনতা এর বিচারের দায়িত্ব আল্লাহর উপর সোপর্দ করেছেন। আল্লাহর পাকড়াও থেকে কেউ বাঁচতে পারবেন না।

বিবৃতিতে আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, বর্তমানে দেশের হাজার হাজার ক্বওমী মাদ্রাসায় সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ওলামায়ে কেরাম বর্তমানে পরীক্ষা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত রয়েছেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরামের মতামত নিয়ে পরবর্তী কর্মসূচী নির্ধারণ করা হবে। হেফাজতে ইসলাম শেষ হয়ে গেছে বা স্তিমিত হয়ে পড়েছে, এটা ভাবার কোন অবকাশ নেই। হেফাজতে ইসলাম ঈমান-আক্বিদা, দেশ ও জাতির যে কোন দুর্দিনে জোরালো পদক্ষেপ নিতে কখনো পিছপা হবে না। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ওলামা-মাশায়েখ প্রতিনিধি দল আমার সাথে দেখা করছেন। আগের চেয়েও দ্বিগুণ মনোবল নিয়ে কর্মসূচী ঘোষণা করতে জোর অনুরোধ করছেন। যারা আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের মধ্যেও দ্বিগুণ মনোবল খুঁজে পাচ্ছি। ঈমান-আক্বীদা এবং দেশের স্বাধীনতা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার এই আন্দোলনে কাউকে পিছপা হতে দেখছি না। বরং ৫ মে’র ঘটনার আগের চেয়েও বর্তমানে দেশের মানুষ হেফাজতে ইসলামের পেছনে আরো বেশী একতাবদ্ধ। সুতরাং সরকারের প্রতি আমি আহ্বান জানাবো, দ্রুত সময়ে ৫ ও ৬ মের ঘটনার সঠিক তথ্য অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ করে অপরাধীদের বিচার করুন। হেফাজতের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত যত মামলা দায়ের করা হয়েছে, সব প্রত্যাহার করে নেতা কর্মীদের মুক্তি দিন। পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবী মেনে নিয়ে বাস্তবায়নে উদ্যোগী হোন। নতুবা জনগণ আপনাদেরকে প্রত্যাখান করবে।